বারি বীজ বপন যন্ত্র
সারিতে বীজ বুনলে কম বীজ লাগে, সহজে আগাছা পরিষ্কার করা যায়, গাছ বেশি আলো বাতাস পায় এবং সর্বোপরি উৎপাদন বাড়ে। এত সব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সারিতে বীজ বোনা কৃষকদের মাঝে বেশকিছু কারণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। সারিতে বীজ বুনতে হলে লাঙ্গলের ফলা বা অনুরূপ কিছু দিয়ে লাইন করে গর্ত করতে হয়, হাত দিয়ে ধীরে ধীরে সারিতে বীজ ফেলতে হয় এবং একটি চাপ দিয়ে লাইন করা গর্ত ঢেকে দিতে হয়। এ কাজগুলো করা কষ্টকর ও সময় সাপেক্ষ বলেই সারিতে বীজ বোনা ততটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। শ্রম নির্ভর ও সময় সাপেক্ষ প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করলে এক ফসল কেটে আরেক ফসল চাষ শুরু করতে সময় (Turn around time) বেশি লাগে। জমি তৈরি ও বীজ বপন একই সময় করতে পারলে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে এই সময়কে যেমন বাঁচানো সম্ভব তেমনি উৎপাদন খরচও কমানো সম্ভব। তাই বারি উদ্ভাবিত পাওয়ার টিলার চালিত বীজ বপন যন্ত্র খুবই কার্যকর। এ যন্ত্র দিয়ে জমিতে রস থাকা অবস্থায় একটি বা দুটি চাষ দিয়ে একই সাথে জমি চাষ, সারিতে বীজ বপন, বীজ ঢেকে দেয়া এ তিনটি কাজ এক সঙ্গে সম্পন্ন করা যায়। এতে বীজ বপনের জন্য আলাদা করে জমি চাষের প্রয়োজন হয় না। এছাড়া স্বল্পচাষে ফসল উৎপাদন ও জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য সংরক্ষণ কৃষির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ লক্ষ্যে বারি বীজ বপন যন্ত্রের ফলার বিন্যাস সমন্বয় করে একই যন্ত্রের মাধ্যমে পূর্ণচাষ এবং সংরক্ষণশীল কৃষির স্ট্রিপ বা ফাঁলি চাষ ও শূন্য চাষ করা যায়। বর্তমানে কৃষকের মাঠে প্রায় ১৭,৫০০ বারি বীজ বপন যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে।
বৈশিষ্ট্য
যন্ত্র তৈরির উপকরণঃ রোটারি টাইন, শ্যাপ্ট, এমএস এ্যাঙ্গেল, এমএস বার, এমএস শীট, পাইপ, পিনিয়ন, সীড প্লেট, সীড মিটার, প্লাস্টিক টিউব, চেইন, স্প্রোকেট, নাট-বোল্ট, ইত্যাদি।
যন্ত্রের বিবরণ
|
· যন্ত্রের ধরন |
: |
পাওয়ার টিলার চালিত বীজবপন যন্ত্র |
|
· সার্বিক মাপ (দৈর্ঘ্যÍপ্রস্থÍউচ্চতা) |
: |
১৩৫০Í৯২০Í৭১৫ মিমি |
|
· প্রয়োজনীয় শক্তি |
: |
১২-২০ অশ্বশক্তির পাওয়ার টিলার |
|
· কার্যকরী প্রস্থ |
: |
১২০০ মিমি |
|
· সংযোগের যন্ত্র |
: |
সাইফেং এবং ডংফেং পাওয়ার টিলার |
|
· ফাল ধারক দন্ডের গতি |
: |
৪৮০-৫০০ আরপিএম |
|
· ফালের ব্যাস |
: |
৩০০ মিমি |
|
· সর্বোচ্চ চাষ গভীরতা |
: |
৫০ মিমি |
|
· ফালের সর্বোচ্চ সংখ্যা |
: |
৪৮ টি |
|
· সর্বোচ্চ ফারো ওপেনারের সংখ্যা |
: |
৬ টি |
|
· সর্বোচ্চ সীড বক্সের সংখ্যা |
: |
৬ টি |
|
· সর্বোচ্চ সীড ডেলিভারি টিউবের সংখ্যা |
: |
৬ টি |
|
· সর্বোচ্চ বেস প্লেটের সংখ্যা |
: |
৬ টি |
|
· সর্বোচ্চ সীড মিটারিং প্লেটের সংখ্যা |
: |
সূর্যমুখী (৪ টি প্লেট), মুগ (৪ টি প্লেট), ফেলন (৪ টি প্লেট), ভুট্টা (২ টি প্লেট), গম (৬ টি প্লেট), ধান (৬ টি প্লেট), সয়াবিন (৪ টি প্লেট) |
|
· অন-অফ লিভার |
: |
১ টি |
|
· প্লেটের আরপিএম পরিবর্তনের সুযোগ |
: |
২ টি পিনিয়নের মাধ্যমে সুযোগ আছে |
|
· চাষের দন্ডের চেইন-স্প্রোকেট |
: |
১ টি |
|
· শক্তি সঞ্চালন চেইন |
: |
১ টি (গ্রেড-৪২৮) |
|
· বিভেল গিয়ারের অনুপাত |
: |
১০:১৫ |
|
· বিভেল গিয়ারের সেট সংখ্যা |
: |
৬ টি |
|
· সারির দূরত্ব |
: |
২০ সেমি. (প্রয়োজনে কম বেশী করা যায়) |
|
· ভাবিক কাজের গতিবেগ |
: |
১-৩ কিমি./ঘন্টা |
|
· মিটারিং ডিভাইসের ধরন |
: |
ইনক্লাইন্ড প্লেট টাইপ |
|
· বক্সের বীজ ধারণ ক্ষমতা |
: |
২০ কেজি |
|
· ওজন |
: |
১৬৭ কেজি |
ফালি চাষ বীজ বপন যন্ত্রে রূপান্তর
সংরক্ষণ কৃষি বা কনজারভেশন এগ্রিকালচার হচ্ছে তিনটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে একটি টেকসই চাষ পদ্ধতি। সংরক্ষণ কৃষির মূলনীতিগুলো হলো (১) স্বল্পচাষ, (২) ফসলের খড় বা রেসিডিউ এর কিছু অংশ রেখে দেয়া ও (৩) লাভজনক শস্যাবর্তন। এই তিন মূলনীতির বাস্তবায়নের জন্য প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে এমন একটি প্লান্টার বা সিডার থাকা যা জমিতে দাড়ানো খড়ের মধ্যে স্বল্পচাষে বিভিন্ন ধরনের বীজ বপন করতে পারে। বারি বীজ বপন যন্ত্রের ব্লেড বা ফালকে সামান্য সমন্বয় করে স্ট্রিপ টিলেজ প্লান্টারে বা ফালি চাষের বীজ বপন যন্ত্রে রূপান্তর করা যায়। ফালি চাষে ফসল ফলাতে চাষের সময় ও খরচ কম লাগে কিন্তু ফলন কমে না বরং কোন কোন ক্ষেত্রে ফলন বাড়ে। স্বল্পচাষে ফসল ফলানোর জন্য আগাছা দমনের বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। স্ট্রিপ টিলেজ প্লান্টারে রূপান্তরের জন্য নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়।
জিরো টিলেজ প্লান্টারে রূপান্তর
সংরক্ষণ কৃষির তিন মূলনীতির বাস্তবায়নের জন্য সারা বিশ্বে যে চাষ পদ্ধতিটি বেশি ব্যবহৃত হয় তা হলো জিরো টিলেজ বা শূন্যচাষ পদ্ধতি। স্ট্রিপ বা ফালি চাষের সাথে এর পার্থক্য হলো এই যে, ফালি চাষে বীজ মাটির গভীরে স্থাপনের পূর্বে বরাবর সামনের জমির ফালিকে চাষ করা হয় আর শূন্য চাষে কোন চাষ না দিয়ে জো সম্পন্ন জমিতে সরাসরি মাটির নীচে বীজকে নির্দিষ্ট গভীরতায় স্থাপন করা হয়। শূন্যচাষে ফসল ফলাতে চাষের সময় ও খরচ কম লাগে কিন্তু দানাদার ফসলের ফলন কমে না। শূন্যচাষেও ফসল ফলানোর জন্য আগাছা দমনের বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। শূন্যচাষ- প্লান্টারে রূপান্তরের জন্য নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়ঃ
কার্যপ্রণালী
পাওয়ার টিলারের রোটাভেটর খুলে বীজ বপন যন্ত্রটি পাওয়ার টিলারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। ফসল অনুযায়ী সারি থেকে সারির দূরত্ব ও গভীরতা ঠিক করতে হবে। জমির এক প্রান্তে পাওয়ার টিলার নিয়ে এবং বীজ বপন যন্ত্রে পরিমাণ মত বীজ ঢালতে হবে। পাওয়ার টিলারের গিয়ার ২ নম্বরে রেখে (গতি ২ থেকে ২.৫ কিমি/ঘন্টা) যন্ত্রটি চালানো শুরু করতে হবে। কাজ করার সময় মই এর চাকার (লাগ হুইলের) খাঁজ অনুসারে হাঁটতে হবে। প্লাস্টিক টিউবের মধ্য দিয়ে সারিতে ঠিকমতো বীজ পড়ছে কিনা তা লক্ষ্য করতে হবে। বীজ বপন যন্ত্র পিছন দিকে নিতে হলে খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। ফারো ওপেনারের পেছনের খোলা অংশে যাতে মাটির ঢেলা না আটকায় সেজন্য যন্ত্রের পেছনের দিক উঁচু করে ঘোরাতে হয়। জমির শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর প্রায় ৮ ফুট (২.৪ মিটার) আগেই বীজ বপন বন্ধ করে দিয়ে ঘোরাতে হয়। ঘোরানোর জন্য স্টিয়ারিং ধরতে হবে, এগিয়ে যাবার জন্যে ধীরে চলতে হয় এবং ঘোরা শেষে পুনরায় বীজ বপনের জন্য ক্লাচ চালু করতে হয়। বীজ বপনের সময় পাওয়ার টিলারের হাতলের সাহায্যে দিক নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং স্টিয়ারিং ক্লাচ ব্যবহার করা উচিত নয়। জমির শেষ মাথায় গিয়ে পাওয়ার টিলার ঘুরানোর সময় এর হাতলের সাহায্যে বপন যন্ত্রটি উঁচু করে ঘুরাতে হবে এবং পাশের সারিতে বীজ বপন শুরু করতে হবে। বীজ প্লেট ঠিকমত ঘুরছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এভাবে জমির এক প্রান্ত থেকে চাষ ও বীজ বপন শুরু করে অন্য প্রান্তে শেষ করতে হয়।
কার্যকারিতা